ইশিকা (Ishika)
ইশিকার ২৪তম জন্মদিন। ঘরের পরিবেশে জন্মদিনের ২৪তম জন্মদিন। ঘরের পরিবেশে জন্মদিনের আনন্দের কোনও বিশেষ চিহ্ন নেই। ইশিকা মায়ের কাছ থেকে অন্তত একটু ভালোবাসা বা শুভেচ্ছা আশা করে।
ইশিকা মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে—
“আজ আমার জন্মদিন। তুমি কি অন্তত আমাকে শুভেচ্ছা জানাবে না?”
মা খুব স্বাভাবিকভাবে উত্তর দেন।
“জন্মদিন তো প্রতি বছরই আসে। এত কিছু করার কী আছে?”
মায়ের নির্লিপ্ত কথায় ইশিকার মুখের হাসি মিলিয়ে যায়।
ইশিকা মায়ের আচরণে কষ্ট পেয়ে নিজের মনের কথা বলতে শুরু করে।
“তুমি কখনও আমার জন্মদিন নিয়ে খুশি হও না। মনে হয় যেন আমার জন্মদিন তোমার কাছে একটা বিরক্তির ব্যাপার।”
মা বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চান। মা বলে
“এত পুরনো কথা নিয়ে আবার শুরু করো না।”
কিন্তু ইশিকা এবার থামতে চায় না। সে বলে
“পুরনো কথা? আমার জন্য তো এটা পুরনো কথা নয়। ছোটবেলা থেকেই আমি এটা অনুভব করেছি।”
ইশিকা এবার সরাসরি জানতে চায়, কেন তার মা তাকে অন্যভাবে দেখেন।সে তার মাকে বলে
“আমি কি তোমার কাছে কখনও অন্য সন্তানদের মতো ছিলাম?”
মা কিছুক্ষণ চুপ থাকেন।
ইশিকা মায়ের নীরবতাকে উত্তর হিসেবেই ধরে নেয়। সে বলে
“তুমি আমাকে কখনও ভালোবাসোনি, তাই তো?”
মা বিরক্ত হয়ে বলেন—
“তুমি এসব কেন ভাবছ? তোমার জীবন তো ঠিকই চলছে।”
ইশিকা মাথা নেড়ে উত্তর দেয়—
“না, ঠিক চলছে না। কারণ আমি সবসময় ভেবেছি, আমার নিজের মা কেন আমাকে ভালোবাসেন না।”
কথাবার্তা ধীরে ধীরে ইশিকার জন্মের প্রসঙ্গে চলে আসে।
ইশিকা জানতে চায়, তার জন্মের সময় মায়ের অনুভূতি কী ছিল।
ইশিকা বলে
“আমি যখন জন্মেছিলাম, তুমি কি খুশি হয়েছিলে?”
মা প্রথমে সরাসরি উত্তর দিতে চান না। পরে বলে
“সবকিছু এত সহজ ছিল না।”
ইশিকা আরও জোর দিয়ে আরও কিছু জানতে চায়—
ইশিকা বলে
“আমি শুধু জানতে চাই—তুমি কি আমাকে চেয়েছিলে?”
ঘরের পরিবেশ হঠাৎ ভারী হয়ে যায়।
অবশেষে মা এমন একটি সত্য প্রকাশ করেন, যা ইশিকার জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক।
মায়ের কথার অর্থ দাঁড়ায়—ইশিকার জন্ম তার পরিকল্পিত বা কাঙ্ক্ষিত ছিল না।
ইশিকা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
তারপর ধীরে ইশিকা বলে:
“তাহলে আমি তোমার কাছে কখনও চাওয়া সন্তান ছিলাম না?”
মা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে বলে।
“জীবনে অনেক কিছু আমাদের ইচ্ছেমতো হয় না।”
ইশিকার চোখে তখন অভিমান ও কষ্ট।
সে বলে
“কিন্তু আমি তো তোমার মেয়ে। এত বছর ধরে আমি শুধু তোমার কাছ থেকে একটু ভালোবাসা চেয়েছি।”
ইশিকা বুঝতে পারে, তার ছোটবেলার অনেক প্রশ্নের উত্তর সে আজ পেয়েছে।
সে মাকে বোঝাতে চায় যে একজন সন্তান তার জন্মের জন্য দায়ী নয়।
ইশিকা বলে
“আমি তো নিজে ঠিক করিনি যে আমি পৃথিবীতে আসব। তাহলে আমার প্রতি তোমার এই রাগ কেন?”
মা চুপ থাকেন।
ইশিকা কষ্টের সঙ্গে বলে—
“তুমি যদি আমাকে না চাইতে, সেটা আমার দোষ ছিল না।”
এই কথাটি ঘরের নীরবতাকে আরও ভারী করে তোলে।
ইশিকা মায়ের কাছ থেকে একটি জিনিসই চায়—স্বীকৃতি।
ইশিকা বলে
“আমি শুধু চেয়েছিলাম তুমি একবার বলো—তুমি আমাকে ভালোবাসো।”
মায়ের প্রতিক্রিয়ায় ইশিকা বুঝতে পারে, সে যে ভালোবাসার অপেক্ষা এত বছর ধরে করেছে, সেটি হয়তো সে কখনও পাবে না।
সে আর তর্ক করে না।
তার মুখে রাগের বদলে গভীর হতাশা ফুটে ওঠে।
২৪তম জন্মদিনে ইশিকা কোনও আনন্দের উপহার পায় না।
বরং সে পায় নিজের জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্যের উত্তর।
সে বুঝতে পারে, তার মায়ের আচরণের কারণ সে এতদিন ধরে যা অনুভব করেছিল, তার সঙ্গেই যুক্ত।
কিন্তু এই সত্য জানার পরও ইশিকা নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে না।
তার কষ্টের মধ্যেও একটি উপলব্ধি তৈরি হয়—
“আমাকে পৃথিবীতে আসার সিদ্ধান্ত আমি নিইনি। তাই আমার জন্মের জন্য আমাকে দোষী করা যায় না।”
ছবিটি এখানেই শেষ হয়—একটি মেয়ের জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ভালোবাসাটি না পাওয়ার বেদনা নিয়ে।
শেষ কথাটি
ইশিকার গল্প আসলে একজন মায়ের গল্প নয়; এটি একজন সন্তানের ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার এবং সেই ভালোবাসা না পাওয়ার দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষতের গল্প।
তার ২৪তম জন্মদিনে ইশিকা বুঝতে পারে, মায়ের কাছ থেকে যে প্রশ্নের উত্তর সে এত বছর ধরে খুঁজছিল, সেই উত্তর হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্য।

0 Comments