সুইজারল্যান্ডের 'টাইম ব্যাংক' বা 'সময় সঞ্চয়' ধারণাটি অত্যন্ত চমৎকার। নিচে এই ধারণাটি বিস্তারিতভাবে এবং ভারতে এর প্রয়োজনীয়তা ও কীভাবে এটি শুরু করা যায়, তা ব্যাখ্যা করা হলো:


Watch more here


সুইজারল্যান্ডের 'টাইম ব্যাংক' বা 'সময় সঞ্চয়' ধারণাটি অত্যন্ত চমৎকার। নিচে এই ধারণাটি বিস্তারিতভাবে এবং ভারতে এর প্রয়োজনীয়তা ও কীভাবে এটি শুরু করা যায়, তা  ব্যাখ্যা করা হলো:

সুইজারল্যান্ডের টাইম ব্যাংক ধারণা: 'জেটভোরসোর্জ' (Zeitvorsorge)

সুইজারল্যান্ডে এই ব্যবস্থাটি মূলত প্রবীণদের সেবার জন্য তৈরি একটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। এর মূল ভিত্তি হলো "আজ অন্যকে সময় দিন, কাল নিজে সেবা নিন।"

 * সময় জমা করা (The Deposit): একজন সুস্থ মানুষ (যিনি অবসরপ্রাপ্ত বা শিক্ষার্থী হতে পারেন) কোনো অসহায় বৃদ্ধ মানুষকে সাহায্য করার জন্য নিজের সময় ব্যয় করেন। তারা ঘর পরিষ্কার করা, বাজার করা, বেড়াতে নিয়ে যাওয়া বা কেবল গল্প করার মতো কাজ করেন।

 টাইম অ্যাকাউন্ট: এই সেবামূলক কাজের প্রতিটি ঘণ্টা একটি ডিজিটাল 'টাইম অ্যাকাউন্টে' জমা হয়। এটি সুইস সোশ্যাল সিকিউরিটি সিস্টেম দ্বারা পরিচালিত হয়।

সময় উত্তোলন (The Withdrawal): যখন ওই স্বেচ্ছাসেবক নিজে বৃদ্ধ হন বা অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন তিনি তার জমা করা সময় ব্যবহার করতে পারেন। তখন টাইম ব্যাংক অন্য একজন নতুন স্বেচ্ছাসেবককে তার সেবার জন্য পাঠিয়ে দেয়।

সরকারি নিশ্চয়তা: সরকার এই সময়ের গ্যারান্টি দেয়, যাতে ভবিষ্যতে স্বেচ্ছাসেবক না পাওয়া গেলেও ওই ব্যক্তি প্রয়োজনীয় সেবা পান।

ভারতে কেন এই ধরনের টাইম ব্যাংক প্রয়োজন?

ভারতে সামাজিক কাঠামো দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, তাই এই ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা এখন সবচেয়ে বেশি:

একাকীত্ব ও একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙন: চাকরির সূত্রে ছেলেমেয়েরা বাইরে থাকায় অনেক প্রবীণ মানুষ বাড়িতে একা থাকেন। এটি তাদের মধ্যে মানসিক অবসাদ ও একাকীত্ব তৈরি করছে।

ব্যয়বহুল নার্সিং সেবা: ভারতে ভালো মানের হোম-কেয়ার বা নার্সিং সেবা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা সাধারণ মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে।

 বিশাল যুবশক্তি: ভারতের বিশাল তরুণ প্রজন্ম এবং সুস্থ অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা রয়েছেন যারা সমাজসেবা করতে চান। টাইম ব্যাংক তাদের এই ইচ্ছাকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামো দেবে।

সেবা করার সংস্কৃতি: ভারতীয় সংস্কৃতিতে 'সেবা' একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। টাইম ব্যাংক এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক রূপ দিতে পারে।

কীভাবে এটি শুরু বা বাস্তবায়ন করা যাবে?

ভারতে এই ব্যবস্থা চালু করার জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে:

১. স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু (পাইলট প্রজেক্ট)

শুরুতেই দেশজুড়ে না করে কোনো একটি আবাসন (Housing Society) বা পাড়ার 'রেসিডেন্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন' (RWA)-এর মাধ্যমে এটি শুরু করা যেতে পারে। একটি খাতা বা সাধারণ অ্যাপের মাধ্যমে কে কত ঘণ্টা সময় দিচ্ছেন তা নথিভুক্ত রাখা হবে।

২. নিরাপত্তা ও ভেরিফিকেশন (Safety)

ভারতে নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আধার কার্ড সংযোগ: প্রত্যেক স্বেচ্ছাসেবকের আধার ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক করতে হবে।

পুলিশ ভেরিফিকেশন: স্বেচ্ছাসেবকদের সঠিক পরিচয় এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যাচাই করতে হবে।

৩. ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা অ্যাপ

একটি অ্যাপ তৈরি করতে হবে যেখানে:

স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের নাম নথিভুক্ত করবেন।

প্রবীণরা তাদের কী ধরনের সাহায্য প্রয়োজন তা জানাবেন।

জমা করা 'সময়' স্বচ্ছভাবে দেখা যাবে।

৪. সরকারি অংশগ্রহণ

মানুষ তখনই এই ব্যবস্থায় ভরসা পাবে যখন সরকার এর পেছনে থাকবে। রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকার যদি এই 'টাইম ক্রেডিট'-কে সামাজিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তবে এটি দীর্ঘমেয়াদী সফলতা পাবে।

সারসংক্ষেপ: কেন এটি একটি বিপ্লব?

টাইম ব্যাংক কোনো দান নয়, এটি একটি পারস্পরিক সহযোগিতা। আজ আপনি কারোর হাত ধরলে, ভবিষ্যতে কেউ আপনার হাত ধরবে—এই নিশ্চয়তাই সমাজকে আরও শক্তিশালী করবে।


Post a Comment

0 Comments