প্রতিবেশী (Padosi)

 



প্রতিবেশী (Padosi)

একই অ্যাপার্টমেন্টে থাকলেও অনেক মানুষ একে অপরের কাছে সম্পূর্ণ অচেনা থেকে যায়। প্রতিদিন বাড়ির ছাদে দেখা হয়,  চোখাচোখি হয়, কিন্তু পরিচয় হয় না। অথচ কখনও কখনও জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির সঙ্গে পরিচয় ঘটে একেবারেই অপ্রত্যাশিতভাবে। "প্রতিবেশী" এমনই দুটি মানুষের গল্প।

শহরের একটি বহুতল আবাসনের ছাদ ছিল পায়েলের প্রিয় জায়গা। দিনের শেষে সে সেখানে এসে ফোল্ডিং খাট পেতে বসতো। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য আলো, দূরের ব্যস্ত রাস্তা আর মাথার উপর বিস্তৃত আকাশ তাকে এক অদ্ভুত শান্তি দিত। বাইরে থেকে তাকে হাসিখুশি মনে হলেও মনের ভিতরে ছিল অনেক প্রশ্ন, অনেক অপূর্ণতা। সে নিজের স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতে চাইত, কিন্তু সবসময় অনুভব করত যেন তার চারপাশের মানুষ তাকে বুঝতে পারে না।

অন্যদিকে, সুজয়  ছিল এক শান্ত স্বভাবের যুবক। সম্প্রতি সে ওই অ্যাপার্টমেন্টে ভাড়া এসেছে। মানুষের ভিড়ের মাঝেও সে নিজেকে একা মনে করত। তারও কিছু স্বপ্ন ছিল, কিছু ইচ্ছে ছিল, যেগুলো বাস্তব জীবনের চাপের কাছে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল।

এক সন্ধ্যায় ছাদের নির্জনতায় প্রথম দেখা হয় তাদের। প্রথমে ছিল শুধুই সৌজন্যমূলক পরিচয়। কিন্তু সেই সামান্য কথোপকথনের মধ্যেই যেন অদৃশ্য এক বন্ধুত্বের সূচনা হয়। পরদিন আবার দেখা হয়। তারপর তারও পরদিন। ধীরে ধীরে ছাদটি তাদের দুজনেরই আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় তারা নানা বিষয়ে কথা বলত। কখনও আকাশের রং নিয়ে, কখনও মানুষের জীবন নিয়ে, কখনও ভবিষ্যৎ নিয়ে। কথার ফাঁকে ফাঁকে তারা নিজেদের মনের দরজাও খুলতে শুরু করে।


একদিন সুজয়  পায়েলকে জিজ্ঞেস করল, "তোমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন কী?"

পায়েল কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, "একদিন নিজের মতো করে বাঁচতে চাই। এমন একটা জীবন, যেখানে সিদ্ধান্তগুলো আমার হবে। আমি কবিতা আর গল্প লিখতে ভালবাসি, আমি একজন বড় লেখিকা হতে চাই"


সুজয় মৃদু হেসে বলল, "স্বপ্নটা সুন্দর।"

পায়েল উত্তর দিল, "সুন্দর স্বপ্নগুলোই সবচেয়ে বেশি ভয় দেখায়।"

সেই দিনই সুজয় প্রথমবার নিজের গল্প বলেছিল। একসময় সে শিল্পী হতে চেয়েছিল। ছবি আঁকাই ছিল তার ভালোবাসা। কিন্তু পরিবারের দায়িত্ব, বাস্তবতার চাপ আর জীবনের হিসাব-নিকাশ তাকে অন্য পথে নিয়ে গিয়েছিল। অনেকদিন আগেই সে রং-তুলির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।

পায়েল অবাক হয়ে বলেছিল, "তুমি যদি এখনও আঁকতে ভালোবাসো, তাহলে বন্ধ করে রেখেছ কেন?"


সুজয়েরর কাছে সেই প্রশ্নের কোনও উত্তর ছিল না।

দিন গড়াতে থাকে। বন্ধুত্ব গভীর হয়। পায়েল সুজয়কে শেখায় স্বপ্নকে আবার বিশ্বাস করতে। আর সুজয় পায়েলকে শেখায় নিজের উপর আস্থা রাখতে। ধীরে ধীরে তারা একে অপরের জীবনের আয়নায় পরিণত হয়, যেখানে লুকিয়ে রাখা সত্যগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


একদিন সুজয়  পুরনো স্কেচবুক বের করে আবার আঁকা শুরু করে। বহুদিন পর সে অনুভব করে, তার ভিতরের শিল্পী এখনও বেঁচে আছে। অন্যদিকে পায়েলও নতুন সাহস নিয়ে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করে।


কিন্তু জীবনের পথ সবসময় এক জায়গায় থেমে থাকে না।

এক সন্ধ্যায় সুজয়  আনন্দের সংবাদ নিয়ে আসে। সে এমন একটি সুযোগ পেয়েছে, যা তার স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ হতে পারে। তবে সেই সুযোগের জন্য তাকে শহর ছেড়ে চলে যেতে হবে।

খবরটি শুনে পায়েল খুশি হলেও তার চোখে এক অদৃশ্য বিষণ্ণতা নেমে আসে। কারণ সে জানত, এই বন্ধুত্বের দিনগুলো আর খুব বেশি দীর্ঘ নয়।


সুজয়ের চলে যাওয়ার আগের দিন দুজনে শেষবারের মতো ছাদে দাঁড়িয়েছিল। অস্তগামী সূর্যের আলো চারদিকে ছড়িয়ে ছিল। যেন প্রকৃতিও বিদায়ের সাক্ষী হতে এসেছে।


পায়েল বলেছিল, "জানো, আমি আগে ভাবতাম মানুষ একাই সবকিছু সামলাতে পারে।"


সুজয়  জিজ্ঞেস করল, "এখন কী মনে হয়?"


"এখন মনে হয়, জীবনের পথে কিছু মানুষ আসে শুধুমাত্র আমাদের বদলে দেওয়ার জন্য।"


সুজয়  চুপচাপ হাসল।


বিদায়ের মুহূর্তে পায়েল বলল, "একটা কথা মনে রাখবে। তোমার স্বপ্নকে আর কখনও হারিয়ে যেতে দিও না।"


সুজয় উত্তর দিল, "আর তুমি তোমার গল্পটা শেষ না করে থেমে যেও না।"


পরদিন সুজয়  চলে যায়। ছাদটি আবার আগের মতো নির্জন হয়ে পড়ে। কিন্তু সুজয়ের জীবন আর আগের মতো থাকে না। সে আবার রং-তুলি হাতে নেয়। আবার স্বপ্ন দেখতে শেখে।

*

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা দুজন হয়তো দূরে সরে যায়, কিন্তু একে অপরের জীবনে রেখে যাওয়া প্রভাব কখনও মুছে যায় না। কারণ কিছু সম্পর্কের নাম থাকে না, কোনও প্রতিশ্রুতি থাকে না, তবু সেই সম্পর্ক আমাদের নতুন করে বাঁচতে শেখায়।


"প্রতিবেশী" আসলে শুধু দুটি মানুষের গল্প নয়। এটি স্বপ্ন, সাহস, বন্ধুত্ব এবং আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্প। এটি মনে করিয়ে দেয় যে কখনও কখনও পাশের বাড়ির একজন অচেনা মানুষও আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।


Post a Comment

0 Comments