সাম্রাজ্য গড়েছিলেন যিনি, শেষ জীবনে ভাড়া বাড়িতে কাটল যাঁর দিন—বিজয়পত সিংঘানিয়ার
গল্প যা প্রতিটি পরিবারের শেখা উচিত।ভারতের ব্যবসায়িক ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁদের গল্প শুধু সাফল্যের নয়—সেই সাফল্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকা একাকীত্বেরও। বিজয়পত সিংঘানিয়া তেমনই একজন। যে মানুষটি Raymond-কে ভারতের ঘরে ঘরে পরিচিত একটি নাম করে তুলেছিলেন, জীবনের শেষ অধ্যায়ে তাঁকে লড়তে হয়েছিল নিজের সন্তানের সঙ্গেই। ২০২৬ সালের ২৮ মার্চ, ৮৭ বছর বয়সে মুম্বইয়ে তাঁর জীবনাবসান হয়—কিন্তু তার আগের এক দশক জুড়ে যে বাবা-ছেলের সংঘাত সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম দখল করে রেখেছিল, তা যেন ভারতীয় পারিবারিক ব্যবসার এক নীরব সতর্কবার্তা হয়ে রইল।
একজন উদ্যমী মানুষের উত্থান
সিংঘানিয়া পরিবার বহু পুরনো J.K. Group-এর উত্তরাধিকারী। এই পরিবার থেকেই বিজয়পত সিংঘানিয়া Raymond-কে আলাদা করে গড়ে তোলেন এক শক্তিশালী শিল্পসাম্রাজ্য। তাঁর হাত ধরেই Raymond হয়ে ওঠে ভারতের অন্যতম পরিচিত টেক্সটাইল ও স্যুটিং ব্র্যান্ড। কিন্তু শুধু ব্যবসা নয়, আকাশেও ছিল তাঁর নেশা। গরম বাতাসের বেলুনে উচ্চতার রেকর্ড গড়া থেকে শুরু করে মাইক্রোলাইট বিমানে ব্রিটেন থেকে ভারত উড়ে আসা—তাঁর জীবন ছিল সাহস আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার এক অনন্য মিশেল।
যেখান থেকে শুরু হয় ফাটল
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। ২০১৫ সালে বিজয়পত তাঁর হাতে থাকা Raymond-এর প্রায় ৩৭ শতাংশ শেয়ার—যার বাজারমূল্য তখন প্রায় ₹১,০০০ কোটি বলে জানা যায়—ছেলে গৌতম সিংঘানিয়ার হাতে তুলে দেন। এই একটি সিদ্ধান্তই যেন হয়ে ওঠে পরবর্তী দশকের সব বিরোধের সূত্রপাত।
এরপর সামনে আসে মুম্বইয়ের বিখ্যাত JK House-কে ঘিরে বিরোধ। redevelopment-এর পর পরিবারের কয়েকজন সদস্যের flat পাওয়ার কথা ছিল পুরনো চুক্তি অনুযায়ী। কিন্তু বছর গড়াতে গড়াতে সম্পত্তির দাম বহুগুণ বেড়ে যায়, আর ২০১৭ সালে শেয়ারহোল্ডারদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সেই প্রস্তাব খারিজ হয়ে যায়। বিজয়পতের অভিযোগ ছিল, ছেলে তাঁর সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি রাখেননি। গৌতমের যুক্তি ছিল উল্টো—কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থই তাঁর কাছে অগ্রাধিকার। বিরোধ গড়ায় আদালত পর্যন্ত।
এই বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত হয় আরও একটি স্তর—উত্তরাধিকার নিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের মামলা। পরিবারের কিছু সদস্য বম্বে হাইকোর্টে আবেদন করে দাবি করেন, পুরনো একটি পারিবারিক চুক্তি তাঁদের ন্যায্য অধিকার প্রতিফলিত করেনি। অর্থাৎ বিরোধটা কেবল বাবা-ছেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়ে গোটা পরিবারে।
"দ্য কমপ্লিট ম্যান"-এর অসম্পূর্ণ পরিবার
Raymond-এর বিখ্যাত স্লোগান ছিল "The Complete Man"। অথচ এই একই পরিবারের ভেতরের ছবিটা যেন তার ঠিক উল্টো—বিপুল সম্পদ, বিলাসবহুল জীবন, অথচ ভেতরে ভেতরে বাবা-ছেলের দূরত্ব, ভাইদের বিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার নিয়ে একের পর এক মামলা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জীবনের শেষ দিকে বিজয়পত নাকি নিজেই আক্ষেপ করতেন—ছেলেকে শেয়ার আর নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে।
এই গল্প থেকে কী শেখার আছে
বিজয়পত সিংঘানিয়ার জীবনের শেষ অধ্যায় আসলে শুধু একটি ধনী পরিবারের কলহের গল্প নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে কয়েকটি গভীর শিক্ষা, যা যেকোনো পরিবারের জন্যই প্রাসঙ্গিক।
প্রথমত, টাকা দিয়ে পারিবারিক শান্তি কেনা যায় না। হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য থাকলেও তা সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের উষ্ণতা নিশ্চিত করে না।
দ্বিতীয়ত, উত্তরাধিকার পরিকল্পনা করতে হয় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে। লিখিত পারিবারিক চুক্তি না থাকা, সম্পত্তি ও ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ কে পাবে তা স্পষ্ট না থাকা, ব্যক্তিগত ও কোম্পানির সম্পদ গুলিয়ে ফেলা—এসব থেকেই পরবর্তীতে ভাইবোনের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে চলা মামলার জন্ম হয়।
তৃতীয়ত, পরিবার আর ব্যবসা এক জিনিস নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে সন্তান ও কোম্পানির প্রধান—দুটো ভূমিকাই তাঁর কাছে দাবি করে ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই যেকোনো পারিবারিক ব্যবসার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
চতুর্থত, সম্পত্তির জন্য সম্পর্ক নষ্ট হলে আসলে কারও লাভ হয় না। টাকা ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক প্রায়ই আর ফেরানো যায় না।
আর সবশেষে—এই গল্প শুধু কোটিপতিদের নয়। আমাদের অনেকের কাছে হয়তো কোটি টাকার সম্পত্তি নেই, কিন্তু একটা ছোট বাড়ি, কিছু জমি বা সামান্য সঞ্চয় ঘিরেও ভাইবোনের সম্পর্ক ভেঙে যেতে দেখা যায় হরহামেশাই। তাই প্রশ্নটা শুধু "সন্তানদের জন্য কতটা রেখে যাচ্ছি" তা নয়, বরং "এমন একটা স্বচ্ছ ব্যবস্থা রেখে যাচ্ছি কি, যাতে আমার পরে তারা একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়াতে না হয়"।
সিংঘানিয়া পরিবারের এই কাহিনি তাই আসলে একটি আয়না। যে সাম্রাজ্য গড়া যায়, লিখে দেওয়া যায় সন্তানের নামে—কিন্তু পরিবারের শান্তি কোনো উইলে লেখা থাকে না। সেটা গড়ে তুলতে হয় বিশ্বাস, স্বচ্ছতা আর পারস্পরিক সম্মান দিয়ে, বহু আগে থেকে।

0 Comments